HomeServicePriestsBlogHow It WorksContact UsBook Now
সাপের দেবী, নাকি মঙ্গলের প্রতীক?

সাপের দেবী, নাকি মঙ্গলের প্রতীক?

শ্রাবণ সংক্রান্তির সঙ্গে বাংলার বহু ঘরের একটি পুরনো আচার জড়িয়ে আছে—দেবী মনসার পূজা। বর্ষার এই সময়ে গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে সাপের আনাগোনা বেড়ে যেত। চাষের জমিতে কাজ করতে গিয়ে সর্পদংশনের ঘটনা একসময় মানুষের জীবনের পরিচিত আশঙ্কা ছিল। সেই বাস্তবতার সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে দেবী মনসাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস। প্রচলিত ধারণা, মনসার আরাধনা করলে সর্পভয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে মনসা পূজাকে শুধু সাপের ভয় থেকে মুক্তির প্রার্থনা হিসেবে দেখলে এর সম্পূর্ণ অর্থ ধরা পড়ে না। বাংলার লোকজ জীবন, পুরাণ, সাহিত্য এবং পারিবারিক বিশ্বাস—সব মিলিয়ে দেবী মনসার পরিচয় তৈরি হয়েছে বহুস্তরে। দেবী মনসা আসলে কে? দেবী মনসার পরিচয় নিয়ে পুরাণ ও লোককথায় একাধিক কাহিনি রয়েছে। তাঁর অন্যতম পরিচিত নাম বিষহরী। প্রচলিত বিশ্বাসে, সর্পবিষের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে বলেই এই নাম। মনসার প্রতিমার মধ্যেও সেই পরিচয় স্পষ্ট। সাধারণত তাঁকে স্বর্ণাভ বর্ণের দেবী হিসেবে কল্পনা করা হয়। মাথার উপরে থাকে সাত ফণাযুক্ত গোখরো সাপের ছত্র, চারপাশেও দেখা যায় নাগের উপস্থিতি। তাঁর চার হাতে বিভিন্ন প্রতীক থাকে—কোথাও শঙ্খ, পদ্ম ও সাপ, আবার কোথাও অভয়মুদ্রা বা জলপূর্ণ কলস দেখা যায়। এই রূপের মধ্যে যেমন সর্পদেবীর পরিচয় রয়েছে, তেমনই রয়েছে এক আশ্বাসদাত্রী মাতৃরূপ। দেবীর বাহনেও রয়েছে বৈচিত্র্য মনসা দেবীকে কোথাও পদ্মাসনে, আবার কোথাও হংসের উপর অধিষ্ঠিত অবস্থায় দেখা যায়। কখনও তাঁকে কোলে পুত্র আস্তিক মুনিকে নিয়ে মাতৃরূপেও কল্পনা করা হয়। এই ভিন্ন ভিন্ন রূপ আসলে মনসা পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনে। অঞ্চল ও প্রথা বদলালে দেবীর রূপের প্রকাশও বদলে যায়। কোথাও তিনি সর্পদেবী, কোথাও মঙ্গলময়ী মা, আবার কোথাও সন্তানের আশীর্বাদদাত্রী মাতৃরূপ। মনসা পূজা আর বাংলার লোকজ জীবন মনসা দেবীর গুরুত্ব বাংলার গ্রামীণ সমাজে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বর্ষা, কৃষিকাজ, মাঠে-ঘাটে সাপের উপস্থিতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে মনসার আরাধনা জড়িয়ে পড়ে। সন্তানকামনা ও পারিবারিক মঙ্গলের জন্যও কিছু অঞ্চলে মনসা পূজার প্রচলন রয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সর্পভয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি আরাধনা বৃহত্তর মঙ্গলকামনার রূপ পেয়েছে। তবে এগুলি মূলত লোকবিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ—অঞ্চলভেদে এর রীতিতেও পার্থক্য রয়েছে। মনসামঙ্গল: দেবী থেকে সাহিত্যের পাতায় মনসা দেবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পরিচয়গুলির একটি তৈরি হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। মনসামঙ্গল কাব্য শুধু দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেনি; তার মধ্যে উঠে এসেছে বাংলার মানুষের জীবন, বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং সেই সময়ের লোকজ সংস্কৃতির নানা ছবি। কবি বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পাশাপাশি নারায়ণদেব, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ ও বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মতো কবিদের রচনাতেও মনসাকে ঘিরে নানা কাহিনি ও বিশ্বাস উঠে এসেছে। তাই মনসামঙ্গলকে কেবল ধর্মীয় কাহিনি হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এই রচনাগুলোর মধ্যে একসময়ের বাংলাকে দেখারও সুযোগ রয়েছে—তার মানুষ, তার বিশ্বাস এবং তার লোকজ জীবনকে। পূজার রীতিও সর্বত্র এক নয় মনসা পূজার আর একটি সুন্দর দিক হল এর বৈচিত্র্য। কোথাও মনসার প্রতিমা তৈরি করে পূজা করা হয়, কোথাও ঘটে, আবার কোথাও সিজ গাছের শাখা বা সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপিকে কেন্দ্র করে দেবীর আরাধনা করা হয়। কোনও কোনও অঞ্চলে পাঁচ সর্পের ফণা যুক্ত প্রতিমারও প্রচলন রয়েছে। অর্থাৎ একই দেবীর পূজা হলেও অঞ্চল, পরিবার ও প্রথা অনুযায়ী তার রূপ বদলে যেতে পারে। এই বৈচিত্র্যই বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য—একটি বিশ্বাস কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না; মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে তার নিজস্ব রূপ তৈরি করে। সাপের দেবী, নাকি মঙ্গলের প্রতীক? প্রশ্নটির উত্তর হয়তো একটিমাত্র শব্দে দেওয়া যায় না। মনসা অবশ্যই বাংলার সর্পদেবী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাসের পরিসর অনেক বড়। তিনি কোথাও বিষহরী, কোথাও মাতৃরূপে পূজিতা, কোথাও সন্তান ও পরিবারের মঙ্গলকামনার সঙ্গে যুক্ত, আবার বাংলা সাহিত্যে তিনি এক বিশাল লোকঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। তাই শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসা পূজার দিকে তাকালে শুধু একটি ধর্মীয় আচার চোখে পড়ে না। তার সঙ্গে দেখা যায় বাংলার প্রকৃতি, মানুষের ভয় ও বিশ্বাস, লোকাচার এবং কয়েকশো বছরের সাহিত্যিক স্মৃতি। সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে। কিন্তু সেই পুরনো বিশ্বাস এখনও বাংলার বহু ঘরে টিকে আছে। আর সেই কারণেই মনসা আজও কেবল সাপের দেবী নন—তিনি বাংলার লোকস্মৃতি ও মঙ্গলকামনার এক জীবন্ত প্রতীক।
← ব্লগে ফিরে যান